তানভীর সরদারঃ
লেখক:আরিয়ান আহমেদ
আমার আর রজ্জবের পথচলা সেই শৈশব থেকে। সময় পেলেই ওর বাসার ছাদে আমাদের আড্ডা জমে উঠত। বিকেল মানেই ছিল আমাদের জন্য বরাদ্দ এক চিলতে স্বাধীনতা। রজ্জব কবুতর পুষত, আর আমি থাকতাম ওর পাশে। মাঝে মাঝে ওর কাকা কাজে চলে গেলে আমাকে দায়িত্ব দিত কবুতরদের খাওয়ানোর। সেই দিনগুলো আজ বড্ড মনে পড়ে। কতো দুপুর আর বিকেলে ওদের গাছের বরই পেড়ে লবণ-মরিচের গুঁড়ো দিয়ে আমরা মেতে উঠতাম অনাবিল আনন্দে।
কিন্তু সেই সাধারণ দিনগুলো হঠাৎ বদলে গেল এক জোড়া চোখের মায়ায়। পাশের বাসার ছাদ থেকে একটি মেয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকত। একদিন রজ্জব সাহস করে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কে?” এভাবেই শুরু। কদিন পর রজ্জবের সাথে ওর ভালো বন্ধুত্ব হলো, কিন্তু আমার সাথে ওর সম্পর্কটা সীমাবদ্ধ রইল কেবল নীরব চাহনিতে। রজ্জব বুঝতে পারল মেয়েটি আসলে আমার দিকেই তাকিয়ে থাকে। আমি তখন প্রেমের এসব জটিলতা নিয়ে সিরিয়াস ছিলাম না, কিন্তু অবচেতন মনে কখন যে মায়ার জন্ম হলো, টেরই পাইনি।
রাত হলে আমরা যখন ছাদে উঠতাম, ও পড়ার ঘরের বসে পড়তো এক সময় পড়া থেকে উঠে পানির বাহানায় জানালায় এসে ইশারা দিয়ে যেত আমি আছি পাড়ায় । ওর দাদা ঘর থেকে তার দাদা না থাকলে লাইট বন্ধ থাকতো এলে লাইট জ্বলত, আবার অন্ধকারে আমাদের নীরব কথা হতো। অনকে সময় বিদ্যুৎ চলে গেলে তার ছোট ভাইয়ের লাল লেজার লাইট দিয়ে অন্ধকারে আমাকে ইশারা দিতো আমি এখানে আর আমি আমার হাতের ঘড়ির লাইট দিয়ে জ্বালিয়ে বলতাম আমি এখানে ,এভাবে কাটল অনেকটা সময়। একদিন রজ্জব হন্তদন্ত হয়ে এসে জানাল, ও মেয়েটির টিকটক আইডি পেয়েছে। এক মুহূর্ত দেরি না করে রিকোয়েস্ট পাঠালাম। কয়েক মিনিটেই একসেপ্ট! আমি কী যে খুশি হয়েছিলাম সেদিন। আমার প্রতিটি ভিডিওতে ওর লাইক আর ওর ভিডিওতে আমার লাইক—এভাবেই কাটল আরও একটি বছর। কোনো কথা হয়নি, শুধু ইশারায় আর মায়ায় বাঁধা পড়েছিলাম আমরা।
সন্ধ্যায় আজান দিলে ও ছাদ থেকে নেমে যেত, কিন্তু ঘরের জানালার গ্রাসের আড়াল থেকে চুল ঠিক করার বাহানায় আমার দিকে তাকিয়ে থাকত। আমি নামার সময় হাত নেড়ে বিদায় দিতাম, ও নিঃশব্দে সাড়া দিত। একদিন রজ্জবের কথায় সাহস সঞ্চয় করে ওর টিকটকের কমেন্ট বক্সে লিখে ফেললাম, “আমি তোমাকে ভালোবাসি।” উত্তর এল অনাকাঙ্ক্ষিত—”আমি এসব হারাম কাজ করি না।”
বুকটা সেদিন ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমি জানতাম, ও পরিস্থিতির শিকার। পরে শুনলাম, আমাদের এই কথাগুলো ওর পরিবার জেনে গেছে। ওর এক কাজিন আমাদের সেই কমেন্ট দেখে সবাইকে বলে দিয়েছিল। এরপর শুরু হলো ব্লক করার পালা। সব দিক থেকে ও আমাকে দূরে সরিয়ে দিল। কিন্তু দীর্ঘ বিরতির পর একদিন একটি ফেক আইডি থেকে আমার কাছে রিকোয়েস্ট এল। মন বলছিল এটা ওই!
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি কে? আমার মন বলছে আপনিই সেই মানুষ।” ও উত্তর দিল, “আমি আপনাকে চিনি না, আর চিনতে চাইও না।” ওর সেই রূঢ় ব্যবহারের আড়ালে আমি এক নিরুপায় আর্তনাদ শুনতে পাচ্ছিলাম। আমি ওকে বলেছিলাম, “একদিন আপনি ভাববেন, একটা পাগল আপনাকে খুব ভালোবাসত। আপনার কারণেই আজ আমার জীবনের দর্শন বদলে গেছে। আমার লেখা দুটো বই পড়লে দেখবেন, তার প্রতিটি পাতা জুড়ে শুধু আপনিই আছেন।”
ও শেষ পর্যন্ত নিজেকে আড়াল করে রাখল এবং আমাকে ব্লক করে দিল। আমার কোনো আক্ষেপ নেই। অন্তত মনের কথাগুলো তো ওকে শেষবারের মতো বলতে পেরেছি। আমি জানি, এই জন্মে ওকে পাওয়া হলো না, হয়তো কোনোদিন ভোলাও সম্ভব হবে না। আমি ভোলার চেষ্টাও করি না।
এই পৃথিবীতে আমি যাকে পেলাম না, বিশ্বাস করি পরকালের অনন্ত জীবনে আমি ঠিকই তাকে খুঁজে পাব।
এই জন্মে না হোক, কোনো এক অনন্ত নীরব ছাদের নিচে—আবারও হয়তো আমাদের চোখাচোখি হবে।
সে যেখানেই থাকুক, ভালো থাকুক। এই পৃথিবীর সবটুকু সুখ তার হোক।
তোমাকে বড় ইচ্ছে করে একটিবার মন বড়ে দেখতে ,কী আর করার নিয়তি যদি সে সময়টুকু না দেয়…
জানো ,
আমার বড় ইচ্ছে করে একটিবার মন বড়ে দেখতে তোমায় ,কোন এক নির্জন সময়ে নিভিতে ,নিভয়ে, নিঃশব্দে ,নিঃস্বার্থে নিঃস্তব্ধতায় একটিবার যদি চোখে চোখ মিলিয়ে বলতে আমি তোমায় ভীষণ ভালোবাসি।
আমি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই কথা টুকোর আশায় ,তুমি আমায় বলবে আমার পাশে এসে বসে আমি সে আশায় আমৃত্যু রইলাম। তুমি বলবে,হয়তো বা না !
তুমি এলেঃ এক অপ্রত্যাশিত আগন্তুক ,
সাদা ক্যানভাসে কালো রূপকথার শিল্পী হয়ে।
তোমার স্পর্শে জমলো এক দাগ, গভীর ও গাঢ়,
যা ঘষে মাজে আরো তীব্র হয়, মসীর মতো উজ্জ্বল।
প্রতিটি ঘষায় ফুটে ওঠে তোমার মুখচন্দ্রের রেখা,
স্মৃতির কালিতে আঁকা এক অনুলেপন।
যত মুছতে যাই, ততই বাড়ে তার ব্যাপ্তি,
হৃদয়ের শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে পড়ে বিষাদের রেখা।
হে দয়াময়, আমার ফরিয়াদ
হে খোদা, শোনো তুমি মোর মোনাজাত,
ক্ষমা করো প্রভু, যতো আছে গুনাহর রাত।
তুমিই তো বিলিয়েছো প্রেম-প্রীতি সবার তরে,
আমার এ আর্জিটুকু নাও না আপন করে।
আমার দীর্ঘশ্বাস আর যতো আছে প্রার্থনা,
শোনো প্রভু, মেটাও মোর মনের সব যাতনা।
যাকে সঁপেছি এই অবুঝ ব্যাকুল মন,
তাকে আমার ভাগ্যে লিখে দাও গো সর্বক্ষণ।
আমায় দেখে যে হাসে, প্রাণের মায়া ছড়ায়,
যাকে পেতে এ দিল দিন-রাত শুধু ভাবনায়।
ওগো দয়াময়, তাকেই আমার করে দাও,
ভালোবাসার এই ছোট মিনতি তুমি চিনে নাও।
শোনো হে প্রভু, শোনো আমার ফরিয়াদ,
ক্ষমা করো মোর যতো আছে অপরাধ।
“মানুষ দোয়া করে সে যেন আজীবন বাঁচে, তার আগে যেন খোদা আমাকে নিয়ে নেয়।
আর আমি বলব: না পেয়ে, আমার আগে যেন তাকে সুখে রেখে মৃত্যু দেয়।
কারণ, আমি তো এই জীবনে তাকে পেলামই না।
তার কবরে গিয়ে তার অস্তি গুলোই উঠিয়ে ছুঁই, একটু আদর করি—দেখি, তখন একটু মনে শান্তি নিয়ে মরতে পারি নাকি।
তাকে পেলাম না, কিন্তু তার অস্তি গুলো ছুঁয়ে আদর করতে পারলাম।”
এটা মনে রেখো অকাল বিচ্ছেদের ভালোবাসা হৃদয়ে চির স্মৃতি থেকে যায় ,মনে থাকে অমলিন ভালোবাসার ছায়া ,শীতল আনন্দে।
যা প্রতিটি প্রহরে মনে করিয়ে দেয়।
যাও ভালো থেকো ,আমি তোমার স্মৃতি নিয়ে বাচি,
একটি কালো দাগই এখন আমার ধ্রুবতারা,
যা ধরে রেখেছে তোমার আগমন ও প্রস্থানের ইতিহাস।