ঝিনাইদহ প্রতিনিধিঃ
ঝিনাইদহ সদরসহ মহেশপুর, কোটচাঁদপুর, কালীগঞ্জ, শৈলকুপা ও হরিণাকুণ্ডু উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ঘুষ, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ না দিলে দলিল রেজিস্ট্রি, নাম সংশোধন, নকল উত্তোলনসহ বিভিন্ন সেবা পেতে নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়। এসব অভিযোগে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী, দলিল লেখক এবং নকলনবিশদের একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে। অনেক ক্ষেত্রে দলিল সম্পাদনের জন্য সরকার নির্ধারিত ফি ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধ করার পরও অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য করা হয়। অতিরিক্ত অর্থ না দিলে নানা অজুহাতে ফাইল আটকে রাখা, কাগজপত্রে ত্রুটি দেখানো কিংবা দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগও রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, দলিল লেখকের ফি ও সরকারি ব্যয়ের বাইরে প্রতিটি দলিলে কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত আদায় করা হচ্ছে। নকল তুলতেও সরকারি ফির চেয়ে বেশি অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, এভাবে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা অবৈধভাবে হাতবদল হচ্ছে।
এদিকে মহেশপুর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের প্রধান অফিস সহকারী (বড় বাবু) মো. সাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে ঘুষ-দুর্নীতি এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ এনে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, নিবন্ধন অধিদপ্তর ও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
অভিযোগকারী মো. আব্দুল্লাহ আল সৈকতের দাবি, সরকারি চাকরির সীমিত আয়ের তুলনায় বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন অভিযুক্ত কর্মকর্তা। তিনি অভিযোগ করেন, তদন্ত হলে সব তথ্য বেরিয়ে আসবে। তবে নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে বিস্তারিত পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি তিনি।
এ বিষয়ে ঝিনাইদহ জেলা রেজিস্ট্রার সাব্বির আহমেদ বলেন, “অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।”
অন্যদিকে অভিযুক্ত প্রধান অফিস সহকারী মো. সাইদুর রহমান সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। আমি কোনো ধরনের ঘুষ বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নই।”
কোটচাঁদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন সেবাগ্রহীতারা। তাদের দাবি, সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ না দিলে জমির রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করা হয় না। শরিকানা জমি, বণ্টননামা ও অন্যান্য দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
কালীগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিস সম্পর্কেও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিভিন্ন ধরনের দলিল নিবন্ধনের জন্য নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হচ্ছে। দলিলের ধরন ও মূল্য অনুযায়ী অতিরিক্ত অর্থ নির্ধারণ করে আদায় করা হয় বলে অভিযোগ করেন একাধিক সেবাগ্রহীতা।
শৈলকুপা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দীর্ঘদিন ধরে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অস্বাভাবিক সম্পদের মালিক হয়েছেন। এসব সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
হরিণাকুণ্ডু সাব-রেজিস্ট্রি অফিস নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ ছাড়া কোনো কাজই সহজে সম্পন্ন হয় না। আদর্শ আন্দুলিয়া গ্রামের আব্দুল ওয়াহাব বলেন, “দালাল ছাড়া অফিসে কোনো কাজ করা যায় না। সরকারি ফির পাশাপাশি অতিরিক্ত টাকা দিতে বাধ্য হয়েছি।” একই ধরনের অভিযোগ করেন নারায়নকান্দি গ্রামের লিয়াকত আলীও।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় একাধিকবার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোর অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়টি উত্থাপিত হলেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত হয়রানি ও অতিরিক্ত অর্থ প্রদানে বাধ্য হচ্ছেন।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তর, নিবন্ধন অধিদপ্তর এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কার্যকর তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও সচেতন নাগরিকরা।