আশিকুর রহমান শান্ত,ভোলা জেলা প্রতিনিধিঃ
ভোলা পৌরসভায় মশক নিধন কার্যক্রমে গত অর্থবছরে প্রায় ৪১ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হলেও পৌর এলাকার অধিকাংশ স্থানে দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম নেই—এমন অভিযোগ উঠেছে। মশার উপদ্রব ও ডেঙ্গুর আতঙ্কের মধ্যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পৌরবাসী।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভোলা পৌরসভায় মশক নিধন কার্যক্রমের জন্য প্রায় ৪৫ লাখ টাকা বাজেট বরাদ্দ ছিল। এর মধ্যে ৪১ লাখ ২২ হাজার ৯০০ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ খাতে আরও ১৮ লাখ টাকা বাজেট রাখা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত ৬-৭ মাস আগে পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় এক-দুইবার ফগার মেশিন দিয়ে ধোঁয়া ও ওষুধ ছিটানো ছাড়া নিয়মিত কোনো মশক নিধন কার্যক্রম চোখে পড়েনি। অথচ বর্তমানে পৌর এলাকার বিভিন্ন ড্রেন ও জলাবদ্ধ স্থানে মশার লার্ভা দেখা যাচ্ছে।
সরেজমিনে পৌর এলাকার আবহাওয়া অফিস রোড, পৌর ভূমি অফিস রোড, ভদ্রপাড়া, গাজীপুর রোড, উকিলপাড়া, কালিবাড়ী রোড, নবী মসজিদ রোড, নূর মসজিদ রোড, মুসলমানপাড়া ও রিজার্ভ পুকুরপাড়সহ বিভিন্ন এলাকায় ড্রেন ও আশপাশে জমে থাকা পানিতে মশার লার্ভা দেখা যায়। বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘদিনের ময়লা-বর্জ্য পড়ে থাকতেও দেখা গেছে।
পৌরবাসীর অভিযোগ, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, ড্রেন পরিষ্কার, নিয়মিত ওষুধ ছিটানো এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের ঘাটতির কারণে মশার উপদ্রব বেড়েছে।
হাসপাতাল রোডের বাসিন্দা মাহমুদুল হাসান বলেন, “বাড়িতে মশার উৎপাত বেড়ে গেছে। মশার জ্বালায় বাসায় থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। কয়েল জ্বালিয়েও রক্ষা পাওয়া যায় না। ছোট বাচ্চাদের মশা কামড় দিলে হাত-পা ফুলে যায়।”
গাজীপুর রোডের বাসিন্দা সাইয়েদ আলীও মশার ব্যাপক উপদ্রবের কথা জানান।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সভাপতি মোবাশ্বের উল্লাহ চৌধুরী বলেন, “ছয়-সাত মাস আগে উকিলপাড়ায় একবার ওষুধ ছিটানো হয়েছিল। এরপর আর কোনো কার্যক্রম দেখিনি। সারাদেশে ডেঙ্গুর ভয়াবহতার মধ্যে পৌরসভার পক্ষ থেকে মানুষকে সতর্ক করা এবং এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা জরুরি। কিন্তু ভোলায় দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম নেই।”
তিনি আরও বলেন, ড্রেন নিয়মিত পরিষ্কার করা ও মশা নিধনে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কাগজে-কলমে কার্যক্রম দেখিয়ে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা দরকার।
উকিলপাড়ার নোমান জানান, গত বছর শীতের পর একবার পৌরসভা থেকে ওষুধ দেওয়া হয়েছিল। এরপর আর কোনো কার্যক্রম হয়নি। বর্তমানে মশার উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় বসতঘরে থাকা কষ্টকর হয়ে পড়েছে বলেও জানান তিনি।
আবহাওয়া অফিস সড়কের বাসিন্দা আরিফ হোসেন বলেন, “সন্ধ্যার পর থেকে মশার উপদ্রব বেড়ে যায়। পৌরসভা থেকে বর্তমানে সরকারি অফিসগুলোতে ধোঁয়া ও ওষুধ দেওয়া হলেও সাধারণ মানুষের বাড়িঘরে তেমন কোনো কার্যক্রম দেখা যায় না।”
বিল্লাহ মসজিদ সড়কের অ্যাডভোকেট শাহাদাত শাহীন বলেন, “প্রতিবছরই মশক নিধনের জন্য পৌরসভার বাজেট থাকে। গত অর্থবছরে প্রায় ৪৫ লাখ টাকা বাজেট হলেও তেমন কোনো কার্যক্রম চোখে পড়েনি। ধোঁয়া ও ওষুধ ছিটানো, ড্রেন পরিষ্কার, সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ বা মাইকিং—কোনোটিই নিয়মিত দেখা যায়নি। তাহলে এত টাকা কীভাবে ব্যয় করা হয়েছে, সেটি পৌরবাসী জানতে চায়।”
তবে মশক নিধন কার্যক্রমে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ভোলা পৌরসভার প্রশাসক ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. বেলাল হোসেন।
তিনি বলেন, “আমি এ বছরের এপ্রিল থেকে ভোলা পৌর প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছি। গত অর্থবছরের অনেক বিষয় আমার জানা নেই। তবে আমার জানামতে, গত অর্থবছরে যে মশার ওষুধ কেনা হয়েছিল, তার কিছু এখনও রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, এ বছর অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে ড্রেন পরিষ্কার ও মশক নিধন অভিযান কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে, বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের পরও পৌর এলাকায় মশক নিধন কার্যক্রমের দৃশ্যমানতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা খতিয়ে দেখতে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে ডেঙ্গু প্রতিরোধে দ্রুত কার্যকর ও নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনারও দাবি জানিয়েছেন তারা।