ঝিনাইদহ প্রতিনিধিঃ
ঝিনাইদহ জেলা শহরে রেললাইন প্রতিষ্ঠার দাবিতে জনসচেতনতা তৈরির আন্দোলন নতুন গতি পায় ২০১৭ সালের ১৫ মার্চ। ওই দিন “ঝিনাইদহ রেললাইন চাই, দেখি কে কে চায়” নামে একটি ফেসবুক পেজের মাধ্যমে অনলাইন প্রচারণা শুরু হয়। আন্দোলনের এ উদ্যোগে নেতৃত্ব দেন সাংবাদিক ও সমাজকর্মী ইফাজ তানভীর মিন্টু। পরবর্তীতে অনলাইনভিত্তিক এই প্রচারণা ধীরে ধীরে গণমানুষের অংশগ্রহণে একটি জনআন্দোলনে রূপ নেয়।
আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালের ২১ জুলাই ঢাকার প্রেস ক্লাবের সামনে ঝিনাইদহে রেললাইন বাস্তবায়নের দাবিতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। একই দিনে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট একটি বিশেষ সভাও অনুষ্ঠিত হয়।
এর আগে ১৮ জুলাই ঝিনাইদহের কলেজশিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ রেললাইন দাবিতে প্রতীকী অনশন কর্মসূচি পালন করেন এবং জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেন।
ঢাকাস্থ ঝিনাইদহ জেলা সমিতির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০১৭ সালের ২৯ জুলাই ঝিনাইদহের সাগর-রুনি অডিটোরিয়ামে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন জেলা সমিতির সাধারণ সম্পাদক একেএম মোজাফফর হোসেন জোয়ার্দ্দার। সংবাদ সম্মেলনে সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ওয়ালিউর রহমান, সাবেক কৃষি সচিব শ্যামল কান্তি ঘোষ, ঢাকা ওয়াসার সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক পরিচালক মো. আনোয়ারুল ইসলাম মন্টু, এম এ লিমিটেডের পরিচালক এম এ লতিফ শাহরিয়ার জাহিদী প্রাঞ্জল, সাংবাদিক ও সমাজকর্মী ইফাজ তানভীর মিন্টুসহ ঢাকায় অবস্থানরত ঝিনাইদহের বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন।
পরে আন্দোলনকে আরও সুসংগঠিত করতে ২০১৭ সালের ২২ জুলাই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক খন্দকার হাফিজ ফারুককে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। পরবর্তীতে অধ্যাপক এন. এম. শাহজালালকে সভাপতি এবং কামরুজ্জামান পিন্টুকে সাধারণ সম্পাদক করে “রেললাইন ও মেডিকেল কলেজ বাস্তবায়ন কমিটি” গঠন করা হয়।
২০১৮ সালে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় সাংবাদিক ও সমাজকর্মী ইফাজ তানভীর মিন্টু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রেললাইন আন্দোলনের প্রতীকী ছবি ব্যবহারের আহ্বান জানান এবং ঘোষণা দেন, ঝিনাইদহে রেললাইন বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত তিনি নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে ওই প্রতীক বহাল রাখবেন। তিনি এখনও সেই প্রতীক ব্যবহার করে আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে আসছেন।
এদিকে, সম্প্রতি জানা গেছে যে ২০১১ সালেও সুজন বিপ্লব, আবু তোয়াব অপু, আরিফুল ইসলাম মিটুল ও অর্পিতা সুলতানাসহ কয়েকজন রেললাইন দাবিতে কিছু কার্যক্রম পরিচালনা করেছিলেন বলে দাবি রয়েছে। তবে এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য লিখিত বা প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি নিশ্চিত ইতিহাসের পরিবর্তে একটি দাবি হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৫ সালের ১৫ এপ্রিল ওয়াজিউল হক শরিফ রেলপথ সচিবের কাছে রেললাইন বাস্তবায়নের দাবিতে একটি আবেদনপত্র জমা দেন। এতে রাশেদ খান, মো. আব্দুল আলিম, হায়দার আলী, শহিদুল ইসলাম ও আব্দুল্লাহসহ কয়েকজন স্বাক্ষর করেন।
এরপর ২০ এপ্রিল “ঝিনাইদহ রেললাইন বাস্তবায়ন পরিষদ”-এর নতুন কমিটি গঠন করা হয়। এতে আব্দুল্লাহ সভাপতি, লিম্পা সাধারণ সম্পাদক এবং ইফাজ তানভীর মিন্টু যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
পরে ২১ মে ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। এতে ফিরোজ আনোয়ার মাসুম, মো. আব্দুস সবুর, মো. জাহিদুল ইসলাম, লিম্পা, আব্দুল্লাহ, ইফাজ তানভীর মিন্টু, শাহিনসহ আরও অনেকে স্বাক্ষর করেন।
রেললাইন বাস্তবায়নের এই দীর্ঘ আন্দোলনে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধি, সাংবাদিক, শিক্ষার্থী এবং সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ অংশগ্রহণ করেছেন।
এদিকে, ঝিনাইদহে রেলস্টেশন বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এগিয়ে যাওয়ায় স্টেশনের নামকরণ নিয়েও মতামত জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। তাদের দাবি, স্টেশনের নাম কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা আন্দোলনের নামে নয়; বরং ঝিনাইদহের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও গৌরবের প্রতীক হয়ে থাকা কোনো কৃতী সন্তানের নামে রাখা হোক। সম্ভাব্য নাম হিসেবে তারা বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান, কে.পি. বসু, পাগলা কানাই, কবি গোলাম মোস্তফা,এলা নিত্র,বাঘা যতীন, বীরপ্রতীক সিরাজুল ইসলাম, বশিরউদ্দিন আহমদ মাজমাদারসহ জেলার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ করেছেন।
আন্দোলনকারীদের ভাষ্য, একটি রেলস্টেশন শুধু যাত্রী পরিবহনের অবকাঠামো নয়; এটি একটি জেলার ইতিহাস, সংগ্রাম ও আত্মপরিচয়েরও প্রতীক। তাই ঝিনাইদহ রেলস্টেশনের নাম এমন একজন কৃতী সন্তানের নামে হওয়া উচিত, যিনি পুরো জেলার গর্ব এবং যার অবদান ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।