তানভীর সরদারঃ
ঝিনাইদহের ইতিহাসে শিক্ষা, অবকাঠামো ও জনকল্যাণমূলক উন্নয়নের ক্ষেত্রে যেসব ব্যক্তিত্ব আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে আছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম বশিরউদ্দিন আহমদ মাজমাদার (১৮৯৮-১৯৭৫)। তিনি শুধু একজন রাজনীতিবিদ বা মন্ত্রীই ছিলেন না, বরং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিক্ষা বিস্তার ও আধুনিক উন্নয়নের একজন দূরদর্শী রূপকার ছিলেন।
১৮৯৮ সালের আগস্ট মাসে ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার ২ নম্বর মির্জাপুর ইউনিয়নের হুদা-মাইলমারি গ্রামের শিক্ষিত ও প্রভাবশালী মাজমাদার পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা ছিলেন নজীর উদ্দিন আহমদ মাজমাদার এবং মাতা সৈয়দা করিমন নেছা।
শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। ঝিনাইদহ মডেল হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করার পর কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে আই.এ. এবং অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দিলেও দেশ ও জনগণের কল্যাণে কাজ করার লক্ষ্য নিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে আত্মনিয়োগ করেন।
রাজনৈতিক জীবনে তিনি নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পরে কনভেনশন মুসলিম লীগ ও পাকিস্তান গণতান্ত্রিক দলে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর অসাধারণ বক্তৃতা দক্ষতা এবং বাংলা-ইংরেজি ভাষায় পারদর্শিতা তাঁকে একজন জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
১৯৬২ সালে কনভেনশন মুসলিম লীগের প্রার্থী হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ত, সেচ ও বিদ্যুৎ মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। শৈলকুপা অঞ্চল থেকে তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি মন্ত্রীত্ব লাভ করেন।
ঝিনাইদহ ও দেশের উন্নয়নে তাঁর অবদান আজও দৃশ্যমান। তাঁর উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত বা বাস্তবায়িত হয় ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ, কালীগঞ্জ সুগার মিল, যশোর শিক্ষা বোর্ড, যশোর পলিটেকনিক কলেজ, যশোর টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া সড়ক উন্নয়ন, ঝিনাইদহ শহরের বিদ্যুতায়ন, নবগঙ্গা নদীর ওপর সেতু নির্মাণ এবং ঝিনাইদহ কে.সি. কলেজকে ডিগ্রি কলেজে উন্নীতকরণসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প।
বিশেষ করে ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা ও পৃষ্ঠপোষক হিসেবে তাঁর নাম ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। শিক্ষা বিস্তার এবং আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণে তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব ঝিনাইদহের উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল।
১৯৭৫ সালের ৫ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তবে তাঁর কর্ম, অবদান ও উন্নয়নের স্বপ্ন আজও ঝিনাইদহবাসীর কাছে প্রেরণার উৎস হয়ে আছে।
একবাক্যে বলা যায়, বশিরউদ্দিন আহমদ মাজমাদার ছিলেন এমন একজন প্রাদেশিক মন্ত্রী, যিনি শিক্ষা ও উন্নয়নের মাধ্যমে ঝিনাইদহকে আধুনিকতার পথে এগিয়ে নিতে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন।