মোঃসুরুজঃ
চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় গ্রিস প্রবাসী রেজাউল হকের ১৮ বছরের হাড়ভাঙা খাটুনির উপার্জিত অর্থ ও সাজানো সংসার তছনছ করে দেওয়ার এক রোমহর্ষক ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা উন্মোচিত হয়েছে। দীর্ঘদিনের পরকীয়া, গোপন অভিসার, প্রবাসীকে মারধর এবং পরবর্তীতে শাশুড়িকে জিম্মি করে সাদা স্ট্যাম্পে টিপসই নিয়ে জাল চুক্তিনামা তৈরির ঘটনায় চুয়াডাঙ্গা জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) সাবেক স্ত্রী মমতাজ পারভীন এবং তার বর্তমান স্বামী স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা কামাল হোসেনের সহযোগীসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চূড়ান্ত অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেছে। এই ঘটনার পর থেকে ভুক্তভোগী পরিবারটি চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। পরকীয়া,গোপন অভিসার ও হাতেনাতে আটক পারিবারিক ও মামলা সূত্রে জানা যায়, আলমডাঙ্গা উপজেলার বেলগাছি ইউনিয়ন কেদারনগর মন্ডলপাড়ার আবু বক্কর ওরফে বাক্কার ছেলে রেজাউল হক দীর্ঘ দিন ধরে গ্রিসে কর্মরত। প্রবাসে থেকে তিনি তাঁর উপার্জিত প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ লক্ষ টাকা এবং অভিযুক্ত কামাল হোসেনের ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর জন্য আরও ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা স্ত্রী মমতাজ বেগমের অ্যাকাউন্টে পাঠান।অভিযোগ উঠেছে, স্বামীর অনুপস্থিতিতে মমতাজ বেগম
বেলগাছি ইউনিয়নের প্রভাবশালী নেতা কামালের সঙ্গে পরকীয়া প্রেমে জড়িয়ে পড়েন। রেজাউলকে না জানিয়ে আলমডাঙ্গা পৌর এলাকায় জনৈক শহিদুল ইসলামের বাসা ভাড়া নিয়ে তারা নিয়মিত মেলামেশা করতেন। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হলে রেজাউলের মা জোসনা বেগম (জরিনা খাতুন) তাদের অনুসরণ করেন এবং একপর্যায়ে ওই ভাড়া বাসায় মমতাজ ও কামালকে আপত্তিকর অবস্থায় হাতেনাতে ধরে ফেলেন। পরে আলমডাঙ্গা থানার এসআই আমিনুর রহমানের সহযোগিতায় সেখান থেকে তাদের উদ্ধার করা হয়।এক নারীর দুই স্বামী: তালাক ও কামালের সাথে বিয়ে ঘটনা শুনে প্রবাসী রেজাউল হক দ্রুত দেশে ফিরে আসেন। মমতাজ নিজেকে ৩ মাসের অন্তঃসত্ত্বা দাবি করে মেডিকেল সার্টিফিকেট দেখালে এবং তাঁর চারিত্রিক অবক্ষয় দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে রেজাউল ইসলাম বাদি হয়ে গত ১৯/০৬/২০২৪ খ্রিঃ তারিখে চুয়াডাঙ্গা আদালতে একটি মামলা (জি আর ৯৬/২৪) দায়ের করেন এবং স্ত্রীকে তালাক প্রদান করেন। পরবর্তীতে মমতাজ পারভীন তাঁর পরকীয়া প্রেমিক ও মামলার অন্যতম অভিযুক্ত প্রভাবশালী নেতা কামাল হোসেনকে বিয়ে করেন। অর্থাৎ, কাগজপত্রে সাবেক স্বামী রেজাউল হলেও বর্তমানে মমতাজ পারভীন প্রভাবশালী নেতা কামাল হোসেনের স্ত্রী।
সাদা স্ট্যাম্পে টিপসই ও ডিবির তদন্তে জালিয়াতীর প্রমান।তদন্ত প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাদী জরিনা খাতুন ছেলের সংসারের কথা চিন্তা করে পুত্রবধূকে ফিরিয়ে আনতে তার বাপের বাড়ি যান। সে সময় মমতাজ ও তার সহযোগীরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে বাদীকে অবরুদ্ধ করে একটি ৫০/- টাকার অলিখিত (সাদা) নন-জুডিসিয়াল স্ট্যাম্পে টিপসই করিয়ে নেয়।পরবর্তীতে ওই ৫০/- টাকার অলিখিত স্ট্যাম্পের সাথে আরও ১টি ১০০/- টাকার মূল্যের স্ট্যাম্প সংযুক্ত করে মোট ১৫০/- টাকার একটি জাল চুক্তিনামা তৈরি করা হয়। উক্ত ভুয়া চুক্তিনামায় অমানবিক শর্তাবলি সংযোজন করে তা দিয়ে পরবর্তীতে ধান, চাল ও নগদ টাকা দাবি করা হয় এবং দাবি পূরণ না করলে খুন করে লাশ গুম করার হুমকি দেওয়া হয়।দীর্ঘ ও নিবিড় তদন্ত শেষে ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা পেয়ে দণ্ডবিধির (৪২০/৪৬৫/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/৫০৬(২) এবং ৩৪ ধারায় অপরাধ প্রমাণিত মর্মে বিজ্ঞ আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন চুয়াডাঙ্গা জেলা গোয়েন্দা শাখা। ভুক্তভোগী গ্রিস প্রবাসী রেজাউল হকের বুকফাটা আর্তনাদ:
"আমি দীর্ঘ ১৮ বছর প্রবাসে থেকে রক্ত পানি করা টাকা পাঠিয়েছি এই বিশ্বাসে যে আমার ফ্যামিলি সুখে থাকবে। কিন্তু আমি জানতাম না সেই টাকা দিয়েই আমার স্ত্রী পরকীয়া করবে আর আমাকেই ঘরছাড়া করবে। কামালের মতো প্রভাবশালী নেতার ক্ষমতার দাপটে আজ আমি নিজ ভিটায় পরবাসী। আমার ৩৫-৪০ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করে এখন যৌতুকের মিথ্যা মামলা দিয়ে আমার বৃদ্ধ বাবা-মাকে হয়রানি করা হচ্ছে। আমি কি এই বিচারটুকু পাব না? একজন প্রবাসীর আর্তনাদ কি কারো কানে পৌঁছাবে না?"রেজাউল হকের বৃদ্ধ বাবা-মা:"আমাদের বউমা ও নাতিরা আমাদের প্রতিনিয়ত মারধর করত। শুধু তাই নয়, আমাদের মিথ্যা মামলায় জেল খাটিয়েছে। আমাদের সাদা স্ট্যাম্পে টিপসই নিয়ে জিম্মি করেছে, সব টাকা-পয়সা লুট করে নিয়ে আমাদের সর্বস্বান্ত করে দিয়েছে।"মমতাজ পারভীন তাঁর বিরুদ্ধে আনা পরকীয়া ও জালিয়াতির সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে সংক্ষেপে বলেন, "আমি তার স্ত্রী না, আমার বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ মিথ্যা।"
বর্তমান স্বামী কামাল হোসেন:কামাল হোসেন দাবি করেন, "রেজাউলের করা সব অভিযোগ বানোয়াট এবং মমতাজের সঙ্গে (পূর্বে) আমার কোনো অনৈতিক সম্পর্ক ছিল না।"
ডিবির চার্জশিটভুক্ত ৭ আসামি: ১. মোছাঃ মমতাজ পারভীন (৪০) (তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী- রেজাউল, বর্তমান স্বামী- কামাল হোসেন) ২. আলম হোসেন (৪৩) ৩. মোঃ একরামুল হক (৩৭)৪. মোঃ আজিজ আহম্মেদ জীবন (২৪) ৫. মোঃ রহিদুল ইসলাম (৪৮) ৬. মোছাঃ হেলেনা খাতুন (৩৯) ৭.মোঃ তারাচাঁদ মিয়া (৫৭) উচ্চশিক্ষিত দুই ছেলের জননী হয়েও মমতাজ বেগমের এমন কর্মকাণ্ড এবং একজন প্রবাসীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের ঘটনায় গ্রামবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। ডিবির এই চার্জশিট দাখিলের পর স্থানীয়রা এই জালিয়াতি ও পরকীয়া চক্রের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।